স্ক্যানডিন্যাভিয়া-অষ্টম পর্ব

 

স্ক্যানডিন্যাভিয়া-অষ্টম পর্ব

ঘুম ভাঙার পর জানলা দিয়ে  তাকাতেই চোখে পড়ল  আকাশে রঙের খেলা।অল্পক্ষণের মধ্যেই জেগে উঠে দেখা দিলেন দিনমণি। আলমোরা ভেঙে বিছানা ত্যাগ করলাম তড়িঘড়ি।  সকাল আটটা নাগাদ হোটেল ছাড়ার কথা।প্রাতঃরাশের পর সবাই তল্পিতল্পাসহ হাজির হলাম reception areaতে।


 সময়মতো ঘরের চাবি hand over করে অপেক্ষা করতে থাকলাম বাসের জন্য। কিন্তু অতি সুন্দর এই হোটেলটায় মাত্র এক রাত্রি কাটিয়ে ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করছিল না। এই লেখার সঙ্গে দেওয়া হোটেলের reception area র কিছু ছবি আমার এই বক্তব্যকে justify করবে আশা করি । সকালে যাত্রা শুরুর পর 
থেকে চারদিকের সব একই ধরনের দৃষ্টিনন্দন  অসংখ্য সরু ছোট ঝর্ণা অতিক্রম করার পর এক বিশাল ঝর্ণার সামনে এসে থামল আমাদের বাস। মুগ্ধ হয়ে বাস থেকেই কিছুক্ষণ বিশাল সাদা জলরাশির প্রবাহ গর্জন উপভোগ করলাম।  তারপর ধীরে ধীরে নেমে আরো কাছে গেলাম- চোখ জুড়িয়ে গেল 

এত কাছ থেকে বিশাল জলরাশির প্রবাহ দেখে। আমাদের দেশে বেশীর ভাগ ঝর্ণার কাছে যাবার পথ থাকে অনেক দুর্গম।পাহাড়ি রাস্তায় অনেকটা কষ্ট করে ওঠা নামা করে কাছে যাওয়া যায়। সেই তুলনায় এখানকার এই ঝর্ণায় পৌঁছানোর অতি সুগম পথ আমাকে অবাক করেছে। আমার কাছে এটা ছিল 
কল্পনাতীত।বেশ কিছুক্ষণ ফ্রি সময় পেয়ে ঝর্ণার ধারার সামনে ঘোরাফেরা ছবি তুলে অনেকটা  সময় কাটালাম।বাকি সময়টা suvenir এর দোকানে window shopping করে কেটে গেল। কোন কোন সহযাত্রী 
কিছু কিনে euro দিয়ে pay করতে গিয়ে সমস্যায় পড়লেন। এটা জানা ছিল না যে Scandinavian সব country EU অন্তর্গত হওয়া সত্ত্বেও euro গ্রহণ করে না।কেউ কেউ euro গ্রহণ করতে রাজি কিন্তু bslance return করবে নিজেদের দেশের currencyতে।যাদের কাছে alternative payment mode হিসাবে debit/credit কার্ড ছিল  না তাদেরকে ওখানকার দোকানদারদের নিয়ম মেনে নিতে হল। এইসব পর্ব শেষ হলে আমরা পরবর্তী গন্তব্যস্থলের দিকে অগ্রসর হলাম। আবহাওয়া আজ বেশ খারাপ। মাঝে মাঝেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। আকাশ আজ সারাদিন মেঘে ঢাকা। যত বৃষ্টি বাড়ছে, ঠান্ডাও বাড়ছে। এই খারাপ আবহাওয়ার ও বৃষ্টিভেজা সুন্দর প্রকৃতির মধ্যে দিয়ে ভ্রমণ করতে করতে একসময় আমাদের বাস এসে থামল লাঞ্চ টাইমে একটা হারবারের সামনে। এখানে আমাদের নামিয়ে বাস চলে গেল।ও আমাদের আবার receive করবে দিনের শেষে ফিওর্ডের ক্রুজ journey আর বিশ্বখ্যাত scenic Flam-Oslo ট্রেন journey র পর। বেশ জাঁকজমকপূর্ণ জায়গা। অনেক খাবারের দোকানের সঙ্গে souvenir , নানারকম হাতের কাজের, উলের তৈরী পোশাক  এর দোকানে ভরা।Waiting area, toilet সহ সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাই আছে। পরবর্তী যাত্রা আমাদের আবার ক্রুজের আর এক ফিওর্ডের মধ্যে দিয়ে। বেশ কিছুটা সময় আমাদের দেওয়া হল refreshment, toilet, shopping ইত্যাদির জন্য। অনর্গল বৃষ্টি পড়তে থাকায় shed এর নীচেই এ দোকান,  সেদোকান ঘুরে minus করে একটা চারদিক খোলা shed এর নীচে অপেক্ষা করার জন্য বসলাম,  যাতে ক্রুজে boarding শুরু হওয়া মাত্র বুঝতে পারি।কিন্তু ক্রমশ ঠান্ডা হাওয়ার তীব্রতা বাড়তে থাকায় ঝুঁকি নিতে সাহস হল না। Shadeএর অন্যদিকে এসে চারিদিক দোকান দিয়ে  ঘেরা  একটা বসার জায়গা পেয়ে সেখানে অপেক্ষা করতে থাকলাম। মুস্কিল হল ফিওর্ডের দিকের visibility block থাকায় কখন boarding শুরু হয়ে গেছে বুঝতে পারলাম না। ফলে লাইনের শেষ দিকে গিয়েই দাঁড়াতে হল।আর ক্রুজের ভেতর গিয়ে দেখলাম 1st floorএর জানলার ধারগুলো সব ব্লক হয়ে গেছে। 2nd floorএ গিয়ে একটা জানলার ধারেপেলাম কিন্তু side এ ডেকের corridor থাকায় ঠিক মজা আসছিল না।ওখান থেকে বেরিয়ে ডেকের খোলাগছে জায়গায় এলাম। 

অসম্ভব ঠান্ডা তীব্র হাওয়ায় দাঁড়িয়ে থাকাই ছিল এক বড় challenge ! তাও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ও কুয়াশাচ্ছন্ন এক রোমান্টিক পরিবেশে  চতুর্স্পাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য ও উপভোগ করার সুযোগ হাতছাড়া করতে ইচ্ছা করল না।শরীরের উপরিভাগ সম্পূর্ণ waterfroof গরম jacket এ মুড়িয়ে পরিবারের অজান্তে পাহাড়ে ঘেরা ফিওর্ডের মধ্যে দিয়ে চলন্ত ক্রুজের ডেকে দাঁড়িয়েই  প্রাকৃতিক সম্পদ দেখতে দেখতে চললাম।ক্রুজ এগিয়ে চলেছে আর ফিওর্ডের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে চোখ জুড়ানো তরঙ্গ।  কত যে পাহাড়,  ঝর্ণা, বনরাশি পেরিয়ে এলাম তার ইয়ত্তা নেই।অসংখ্য সুন্দর সুন্দর দৃশ্য জমা হল চোখের মধ্যে দিয়ে মনের মণিকোঠায়। এদিকে অনেকক্ষণ দেখতে না পেয়ে চলে এসেছে ছেলে আমায় খুঁজতে খুঁজতে বৌদিদের এর বার্তা নিয়ে । অগত্যা আদেশ মেনে বসতে হল ভেতরে গিয়ে আমার জন্য বেছে রাখা transperent window screen এর পেছনে একদম সামনের seat এ।যাতে view দেখার জন্য  বাইরে যেতে না হয়। Side wall এ ছিল একটা display board. যখনই ক্রুজ কোন বিশেষ স্থান অতিক্রম করেছিল, board এ 
ভেসে আসছিল তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। এই displayগুলো থেকে এই ফিওর্ডের প্রকৃতি ও পরিবেশ সংক্রান্ত বেশ কিছু তথ্য জানা গেল।  কিছু নমুনা আমার দেওয়া ছবি তে দেখা যাবে। কয়েকটা displayর বিষয়ের নিজের সাধ্যমত বাংলা অনুবাদ করে পাঠকদের জ্ঞাতার্থে পর পর অনুচ্ছেদে দিলাম। ভুল ভ্রান্তি হলে আশা করি correction করে দেবেন।

যেতে যেতে এইরকম একটা ছবিসহ বর্ণনা ভেসে এল। যেটার মাধ্যমে সবাইকে জানানো হল, শীঘ্রই আমরা  ডাইর্ডল নামক একটা জায়গায় পৌঁছাচ্ছি। এখানে অল্প কিছু সময়ের জন্য থামা হবে।একসময় ফিওর্ডের পাশে এই ঘন সবুজ জায়গায় শ'খানেক লোক বাস করত।এই সবুজ বনরাশির farm আগে সমগ্র উপত্যকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল ।কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেগুলো এখন অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে। এই farmগুলোর বেশীরভাগই  এখন অন্যান্য অনেক জায়গার মতোholiday home বা rental এ পরিবর্তিত হয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি অবধি এখানে অনেক কাজকর্ম হতো, আর এখানকার গ্রাম নরওয়ের আইনব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুর মর্যাদা পেত।কোর্ট হাউস ছাড়া ও এখানে ছিল অনেক guest house, কিছু দোকান এবং আটটা bed বিশিষ্ট হাসপাতাল।আজকাল গ্রীষ্মকালেই এখানে বেশীরভাগ কাজকর্ম হয় যখন holiday home এর মালিকরা touristদের আকর্ষণ করতে ব্যস্ত থাকে।

এর পরের বর্ণনা ছিল এইরকম- এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না কেন লোকে ফিওর্ডের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অন্ধ হয়ে লোক এখানে আসে, কিন্তু যখন দুর্ভেদ্য ঘন কুয়াশার চাদরের মধ্যে দিয়ে এখানে উপত্যকার পাশ দিয়ে অন্ধকার নেমে আসে, কিছু একটা ঘটতে দেখা যায়। কারণ তখন হালডার লোকেরা জেগে ওঠে। দিনেরবেলা ওরা মাটির নিচে  থাকে,  কিন্তু যখনই অন্ধকার ঘনিয়ে আসে ওরা সমতলের উপর উঠে এসে অধিবাসীদের ভয়ের কারণ হয়। এইসব ফিওর্ডের ছোট ছোট গ্রামে খৃষ্টমাস ও বিবাহ অনুষ্ঠান উদযাপনের সময় হালডার লোকেদের উপদ্রব/হাঙ্গামার অনেক গল্প আছে। কৌতূহলবশত Huldre শব্দটার সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচিত হবার জন্য Googleএর সাহায্য নিলাম।স্ক্যানডেনিভিয়ান লোককাহিনী অনুযায়ী এরা হল গরুর লেজযুক্ত সুন্দরী মহিলার রূপ ধরে থাকা এক প্রলোভনকারী বন্যপ্রাণী যারা বনে থাকে এবং নিজের সৌন্দর্য এবং গান দিয়ে পুরুষদের আকর্ষণ করে।নরওয়ের লোককাহিনী অনুযায়ী এরা হল গরুর লেজযুক্ত সুন্দরী মহিলার আকারের  এক অতিপ্রাকৃতিক সত্তা বা অলৌকিক প্রাণী। কোথাও এটাও বলা আছে প্রলোভন দেখিয়ে পুরুষদের আকর্ষণ করার পর ওরা বিপজ্জনক রূপ ধারণ করে।অর্থাৎ অন্ধকার ঘনিয়ে এলে ফিওর্ডের পরিবেশ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

অপর একটা বোর্ডে লেখা ভেসে উঠল আমরা এখন একটা বনের মধ্যের ঝর্ণা অতিক্রম করছি।বাইরে তাকিয়ে দেখলাম  অনেক উঁচু থেকে নেমে আসছে এক ঝর্ণা। বর্ণনা অনুযায়ী এটা ফিওর্ডের থেকে 600মিটার উঁচু মালভূমি থেকে নেমে সমুদ্রে মিলিয়ে যায়।আর নৌকা সাহায্যেই শুধু এটার কাছে পৌঁছানো যায়। এইসব ফিওর্ডের থেকেই ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে নরওয়েতে পর্যটনের সূচনা হয়েছিল। উচ্চবিত্ত ইংরেজ ও জমিদাররা নরওয়ের ফিওর্ডের প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য বাlandscape এ অভিভূত মুগ্ধ হয়েছিল যেখানে তারা বড় বড় সালমান মাছ ধরতে পারত এখানকার নদী থেকে আর দূরের সমতল ভূমিতে চড়তে থাকা  প্রাণবন্ত হরিণ শিকার করতে পারত।ইয়াচ করে তারা ফিওর্ডের জলপথে ভ্রমণ করে বেড়াত আর ফিওর্ডের যেকোনো এক sideএ নোঙর ফেলত।তারা সপ্তার পর  সপ্তা বছরের পর বছর এখানে থেকে বিলাসবহুল জীবনযাপন করত।

পরবর্তী বোর্ডে বোঝাল এখন আমাদের ক্রুজ দুটো ছোট ফিওর্ডের মিলিত হয়ে একটা বড় ফিওর্ডের সৃষ্টির জংশনে।তারপর দেখাল ফিওর্ড পরিবেশের পশুদের সম্বন্ধে বিবরণ। এখানকার চতুর্দিকের পরিবেশ, সমুদ্র ও পাহাড়ের  নান্দনিক দৃশ্য দেখে সহজেই বিমুগ্ধ হওয়া যায়। কোন ভালো দিনে সীলদের  পর্বতের ওপর রোদ পোহাতে দেখতে পার। যখন তখন শুশুকের শরীরের উপরিভাগ ফিওর্ডের জলের ওপর ভেসে উঠতে দেখা যায়। তবে সব থেকে সুন্দর লাগে যখন তিমি খেলা করতে আসে ফিওর্ডে।কখনও পর্বতের sideএ ছাগল লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে বেড়ায়,  সবুজ জমি তে ভেড়া আর গরুদের হামেশাই চড়ে বেড়াতে দেখা যায়। বন্য জন্তুদের মধ্যে হরিণ জাতীয় প্রাণী যেমন সাধারণ হরিণ,  এলক্,  রেনডীয়ার সবসময় পর্বতের দুপাশের slopeএই দেখা যায়। ফিওর্ডের অধিবাসীদের এগুলো অন্যতম খাবারের উৎস।

এর পরের display র contents অনুবাদ করলে দাঁড়ায় এরকম: তুমি যদি কল্পনা করে থাক ফিওর্ডের মৃদু হাওয়ায় উঁচু পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে সূর্যোদয় দেখতে দেখতে ও নদীর জলের কলকল ধ্বনি শুনতে শুনতে সকালে জাগবে,  তাহলে তুমি একা নও।1992 সালে ডী কানিংহাম নামে একজন আমেরিকার অধিবাসী এই সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য   360মিটার উঁচুতে পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত এখানকার স্টাইগেন ফার্ম কিনে নেন। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী এর কুঠিগুলোকে  সংরক্ষণ করে এই ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদকে প্রকৃতি প্রেমিক পর্যটকদের জন্যে রত্ন বা অত্যন্ত মূল্যবান  সুবিধায় রূপান্তরিত করেন।এই ছোট পাহাড়ি ঘন সবুজ জায়গায় মধ্যযুগ থেকে লোক থাকছে এবং বর্তমানে স্টাইগেন একটা  ফিওর্ডে ঝাঁপ দেবার এক জনপ্রিয় জায়গা। রাতে থাকার জন্যেও জায়গা দেওয়া হয়। অতিথরা এখানকার উত্তেজনাপূর্ণ সাংস্কৃতিক ইতিহাস শিখতে পারে এবং প্রতিদিন সকালে পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশ্বঐতিহ্যবাহী চিত্তাকর্ষক ফিওর্ড ভূচিত্রের অমূল্য দৃশ্য উপভোগ করতে করতে জাগতে পারে।


পরবর্তী displayতে জানানো হল আমরা এখন যেখানে পৌঁছাতে যাচ্ছি তার  নাম অরল্যান্ডসভ্যানজেন।এখানে পা রাখার সাথে সাথে অদ্ভুত প্রাকৃতিক শক্তির বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন শুরু হ্য়।এখান থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা ফিওর্ড অথবা নরওয়ের সবচেয়ে লম্বা সুড়ঙ্গ, ঘন সবুজ উপত্যকা এবং হিমবাহ দেখতে পার।






এইসব display বোর্ডের মাধ্যমে ফিওর্ড ও তার চতুর্স্পাশের পরিবেশের সম্বন্ধে বিষদ জ্ঞান আহরণ করতে করতে আমাদের ক্রুজ টার্মিনাসে এসে নোঙর করে গেল। মেঘাচ্ছন্ন পরিবেশে বরফাবৃত পাহাড় দিয়ে ঘেরা ভূমিতে আমরা একে একে ফিওর্ড ক্রুজ থেকে অবতরণ করলাম। আবার সব ভূমি, জল, পাহাড়, বরফ ও মেঘের সম্মিলিত সব নয়নাভিরাম দৃশ্য আমাদের কে স্বাগত জানাল নতুন জায়গা ফ্ল্যামে।এর সঙ্গেই শেষ হল আমাদের ফিওর্ডের মধ্যে দিয়ে যাত্রা এবং ফিওর্ড সংক্রান্ত বিষাদ জ্ঞান আহরণের পর্ব। চারদিক ঘুরে ফিরে দেখা  market survey, window shopping, প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ ও photo session এর জন্য পেলাম বেশ কিছুটা সময়। সেটার উপযুক্ত সদ্ব্যবহার করে আমরা এলাম ফ্ল্যাম রেল স্টেশনে।
বিশ্রামাগারে জায়গা নিয়ে বসলাম।আমার ছেলে তখনও DSLR ক্যামেরা নিয়ে আরো deep survey
করে বেড়াচ্ছে।  

এখন অপেক্ষায় ফ্ল্যাম থেকে ওসলো পৃথিবীর অন্যতম সবচেয়ে সুন্দর scenic ট্রেন journeyর জন্য।স্টেশনের display করা তথ্য থেকে জানলাম, 
National geographic travel magazine ফ্ল্যাম railwayকে ইউরোপের 
প্রথম দশটা ট্রেন journey র মধ্যে স্থান দিয়েছে।Lonely Planet magazine আরো এগিয়ে এটাকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ট্রেন journey হিসাবে আখ্যা দিয়েছে। 




এই railway র নির্মাণ শুরু হয়ে ছিল 192সালে আর শেষ হয় 1940 সালে। এটাকে  Norwayএর সর্বশ্রেষ্ঠ কারিগরি বা প্রকৌশলের অসাধারণ কীর্তি হিসাবে গণ্য করা হয়। 20কিমি দীর্ঘ এই লম্বা স্ট্যান্ডার্ড গেজ লাইন  পৃথিবীর সবচেয়ে খাড়া লাইনগুলোর মধ্যে অন্যতম।যাত্রাপথের আশী শতাংশেরই ঢাল 5.5%. কম করে 20টা সুড়ঙ্গ আছে, যার মধ্যে 18টাই হাতে তেরী।এগুলোর মধ্যে একটা সুড়ঙ্গ তো পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে 180ডিগ্রি বাঁক নেয়।   
শঙ্কুবাবু গেছেন টিকিট সংগ্রহ করতে আর আমাদের ট্রেনের বিষয়ে জানতে। আমরা ইতিমধ্যে যে যার মতো ছোট বড় toilet, চা/কফি, snacks সেবন করে রোমাঞ্চকর যাত্রার জন্য প্রস্তুত হলাম। শঙ্কুবাবু ফিরে এলে আমরা তাকে অনুসরণ করতে রেল স্টেশনের প্লাটফর্মে গেলাম। খালি ট্রেন দাঁড়িয়েই ছিল।দরজা খোলার সাথে সাথে ট্রেনে উঠে জানলার ধারে জায়গা নেবার জন্য নিজেদের মধ্যে ছোট প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। কারণটা বলাই বাহুল্য। আমরা একটা জানলার ধারে দুজনে মুখোমুখি বসলাম আর ছেলে বসল একটু দূরে অন্য দিকের জানলার ধারে। আমরা প্রথমে যাব ফ্ল্যাম থেকে মাইরদল ,তারপর সেখান থেকে অন্য একটা ট্রেনে যাব ওসলো।
ট্রেন ছাড়ার সাথে সাথে একে একে দুদিকের জানলার ধারে হাজির হতে থাকল সবুজ ফ্ল্যাম উপত্যকা,  পাহাড়, ঝর্ণা আর ফিওর্ডের সব অসাধারণ দৃশ্য। যখন যেদিকে ভালো দৃশ্য আসছে,  বেশির ভাগ যাত্রী সেই দিকে ভীড় করছে। কামরার মধ্যে সে এক অদ্ভুত উত্তেজনাময় পরিস্থিতি!রেল লাইন বরাবর চলেছে একটা পাকা রাস্তা। খুব একটা চওড়া নয়।জানা গেল ফিওর্ড থেকে নেওয়া মাটি_পাথর ব্যবহার করে শ্রমিকদের হাতেই তৈরি এই রাস্তা। রাস্তার ওপারে দিয়ে প্রবল বেগে প্রবাহিত হচ্ছে এক নদী।"সাগর সবুজ" রঙের তার স্বচ্ছ জলধারা।
নদীর ওপর পারে হল উপত্যকায় সবুজের সমারোহের মাঝে ছোট ছোট বসতি।আর দুরে আরও উঁচুতে  বরফাবৃত পাহাড়। কিছুদূর অন্তর উপত্যকা ভেদ করেসেখান থেকে নেমে আসছে ঝর্ণা আর মিশে যাচ্ছে নদীতে।এইসব দৃষ্টিনন্দন দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে প্রবল বেগে ছুটে চলেছে ট্রেন আমাদের আনন্দ দিতে দিতে। আর আমরা মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করতে করতে চলেছি। বলে রাখা ভালো এখানকার ট্রেনে ড্রাইভার,  কন্ডাক্টর,  গার্ড, টিটিই সব একই ব্যক্তি। কয়েকটা ছোট ঝর্ণা, ঝর্ণাদের crisscross এ তৈরী network অতিক্রম করার পর তিনি announce করলেন ট্রেন কয়েক মিনিটের জন্য থামবে রেল লাইন cross করে যাওয়া বিশেষ ঝর্ণার দৃশ্য আর তার গর্জন উপভোগ করার জন্য। অত্যুত্সাহী আমরা কয়েকজন নামধাম আর বাকিরা ট্রেনে বসেই জানলা দিয়ে উপভোগ করলেন।

অসাধারণ এই চিত্তাকর্ষক দৃশ্য ভাষায় বর্ণনাতীত।এমন অভিভূত হয়ে দেখতে থাকলাম ট্রেন ছাড়ার সময়ের কথা মাথা থেকে বেরিয়ে গেল। ট্রেন ছাড়ার final whistle এর সঙ্গে সঙ্গে শঙ্কুবাবুর চিৎকার! দৌড়ে গিয়ে ট্রেনে উঠলাম। কিছুক্ষণ হাঁপিয়ে নিয়ে স্বাভাবিক হবার পর যখন ভাবলাম ট্রেন ছেড়ে গেলে কি হত! গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল, কারণ এখান থেকে tour operator আমায় ট্রেন ঘুরিয়ে ফেরত নিয়ে যেতে পারত না! আবার একবার মহান ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়ে জানলার দিকে মনোনিবেশ করলাম। অল্পক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম Myrdal। নামতে গিয়ে দেখি ঘন মেঘ আর বৃষ্টি পড়ছে ঝিরিঝিরি,  স্টেশনটা ঘেরা বরফাবৃত পাহাড়ে। এই মায়াবী 

পরিবেশে ট্রেন থেকে নামামাত্রই শুরু হয়ে গেল ছবি তোলার হিরিক ট্রেন আর প্রকৃতিকে নিয়ে। বৃষ্টির তেজ বাড়তে শুরু করলে ছাতা বের করতেই হল।কিছু ফটো ছাতাসহ তোলার পর আমরা ধীরে ধীরে একটা shade এর নিচের বিশ্রাম হলে গিয়ে বসলাম। এখন অপেক্ষা ওসলোগামী পরবর্তী ট্রেনের জন্য। বসে বসে আগের ট্রেন যাত্রার দৃশ্যগুলোর স্মৃতি রোমন্থন করছি , স্টেশনের wifi ব্যবহার করে mobile খুট খুঁট করছি, দেখলাম ঢুকল  শঙ্কুবাবুর সতর্কতার message প্রস্তুত হবার জন্য-ট্রেন ঢুকছে।সঙ্গে সঙ্গে আমরা একটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে লাইনের কাছে এসে দাঁড়ালাম।ট্রেনে উঠে দেখলাম কামরা মোটামুটি ফাঁকা। Hardly চার পাঁচজন লোক এদিক ওদিক বসে আছে। ট্রেন ছাড়তেই আবার শুরু হল প্রকৃতির নতুন লীলা আর চারিদিকে দেখি শুধু বরফের মেলা। শুরু হল আমাদের আবার দুদিকের জানলার দিকে ছোটাছুটি আর নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখার পালা। যতদূর চোখ যায় দেখি চারিদিকের  প্রকৃতি শুধু  বরফে বরফে সাদা।সমস্ত প্রকৃতি যেন সাদা আভরণ দিয়ে নিজেকে সুসজ্জিতা করে তুলেছে।  


এই অসাধারণ সাদা বরফিল পরিবেশ ভেদ করে এগিয়ে চলেছে আমাদের ট্রেন। কোথাও দেখলাম এই সাদা বরফের কার্পেটের ওপর মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে আছে জনমানবশূন্য দু একটা বাড়ি।কোথাও কিছু কিছু বরফাবৃত পাহাড়ের পাদদেশের বরফ গলে গিয়ে তৈরী হয়েছে জল প্রবাহ, আর সবুজাভ সেই জলে ভাসছে বড় বড় বরফের বড়  বড় চাঁই। কোথাও কোথাও বিশাল এলাকাজুড়ে পর্বতমালার সবুজের মাঝে মাঝে সাদা বরফের কার্পেট এক অদ্ভুত সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে। সব মিলিয়ে যেন এক স্বপ্নিল পরিবেশের মধ্যে দিয়ে আমরা চলেছি যেন প্রকৃতির অমৃত রস পান করতে করতে। প্রায় পাঁচ-ছয় ঘন্টা যেন কেটে গেল এক মধুর স্বপ্নের জগতে ।ট্রেন থামার সাথে সাথে ফিরে এলাম বাস্তবে।একে একে স্টেশন থেকে নেমে অপেক্ষারত বাসে উঠে বসলাম। অচিরেই পৌঁছলাম দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এক বড় হোটেলে।তখন বাজে প্রায় সন্ধ্যা সাড়ে আটটা। হোটেলের ঘরে ঢোকার আগেই করে নিতে হল নৈশভোজ সময় প্রায় অতিক্রান্ত হওয়ায়।  সারাদিনের ক্লান্তিকর যাত্রাশেষে fresh হয়ে  ক্যামেরা ও মোবাইলগুলো চার্জে বসিয়ে পরের দিনের জন্য পোশাক ও ব্যাগ ready করে বিছানা নেবার সাথে সাথে শেষ নরওয়ের ফিওর্ড কেন্দ্রিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দর্শন ও তথ্য সংগ্রহ। প্রধানতঃ ফিওর্ডের অভিজ্ঞতার জন্যই পরিকল্পনা করেছিলাম এই স্ক্যানডেনিভিয়ান দেশগুলোতে বেড়ানোর। সেই উদ্দেশ্যে সন্তোষজনকভাবে সফল


এবারের পর্বের বর্ণনা তুলনামূলকভাবে একটু বাড় হয়ে গেল। লেখাটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছবি follow করলে পুরো কাহিনীটা ভালো করে visualise ও উপভোগ করা যাবে আশা করি। আজ তবে এইটুকু থাক।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

Scandinavia-2

কাফেরগাঁও ভ্রমণ