স্ক্যানডিন্যাভিয়া-অষ্টম পর্ব
স্ক্যানডিন্যাভিয়া-অষ্টম পর্ব








যেতে যেতে এইরকম একটা
ছবিসহ বর্ণনা ভেসে এল। যেটার মাধ্যমে সবাইকে জানানো হল, শীঘ্রই আমরা ডাইর্ডল নামক একটা জায়গায় পৌঁছাচ্ছি। এখানে
অল্প কিছু সময়ের জন্য থামা হবে।একসময় ফিওর্ডের পাশে এই ঘন সবুজ জায়গায় শ'খানেক লোক
বাস করত।এই সবুজ বনরাশির farm আগে সমগ্র উপত্যকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল ।কিন্তু
দুর্ভাগ্যবশত সেগুলো এখন অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে। এই farmগুলোর বেশীরভাগই এখন অন্যান্য অনেক জায়গার মতোholiday home বা rental
এ পরিবর্তিত হয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি অবধি এখানে অনেক কাজকর্ম হতো, আর
এখানকার গ্রাম নরওয়ের আইনব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুর মর্যাদা পেত।কোর্ট হাউস ছাড়া ও
এখানে ছিল অনেক guest house, কিছু দোকান এবং আটটা bed বিশিষ্ট হাসপাতাল।আজকাল
গ্রীষ্মকালেই এখানে বেশীরভাগ কাজকর্ম হয় যখন holiday home এর মালিকরা touristদের
আকর্ষণ করতে ব্যস্ত থাকে।
এর পরের বর্ণনা ছিল
এইরকম- এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না কেন লোকে ফিওর্ডের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অন্ধ
হয়ে লোক এখানে আসে, কিন্তু যখন দুর্ভেদ্য ঘন কুয়াশার চাদরের মধ্যে দিয়ে এখানে
উপত্যকার পাশ দিয়ে অন্ধকার নেমে আসে, কিছু একটা ঘটতে দেখা যায়। কারণ তখন হালডার
লোকেরা জেগে ওঠে। দিনেরবেলা ওরা মাটির নিচে
থাকে, কিন্তু যখনই অন্ধকার ঘনিয়ে
আসে ওরা সমতলের উপর উঠে এসে অধিবাসীদের ভয়ের কারণ হয়। এইসব ফিওর্ডের ছোট ছোট
গ্রামে খৃষ্টমাস ও বিবাহ অনুষ্ঠান উদযাপনের সময় হালডার লোকেদের উপদ্রব/হাঙ্গামার
অনেক গল্প আছে। কৌতূহলবশত Huldre শব্দটার সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচিত হবার জন্য Googleএর
সাহায্য নিলাম।স্ক্যানডেনিভিয়ান লোককাহিনী অনুযায়ী এরা হল গরুর লেজযুক্ত সুন্দরী
মহিলার রূপ ধরে থাকা এক প্রলোভনকারী বন্যপ্রাণী যারা বনে থাকে এবং নিজের সৌন্দর্য
এবং গান দিয়ে পুরুষদের আকর্ষণ করে।নরওয়ের লোককাহিনী অনুযায়ী এরা হল গরুর লেজযুক্ত
সুন্দরী মহিলার আকারের এক অতিপ্রাকৃতিক
সত্তা বা অলৌকিক প্রাণী। কোথাও এটাও বলা আছে প্রলোভন দেখিয়ে পুরুষদের আকর্ষণ করার
পর ওরা বিপজ্জনক রূপ ধারণ করে।অর্থাৎ অন্ধকার ঘনিয়ে এলে ফিওর্ডের পরিবেশ বিপজ্জনক
হয়ে উঠতে পারে।
অপর একটা বোর্ডে লেখা
ভেসে উঠল আমরা এখন একটা বনের মধ্যের ঝর্ণা অতিক্রম করছি।বাইরে তাকিয়ে দেখলাম অনেক উঁচু থেকে নেমে আসছে এক ঝর্ণা। বর্ণনা
অনুযায়ী এটা ফিওর্ডের থেকে 600মিটার উঁচু মালভূমি থেকে নেমে সমুদ্রে মিলিয়ে যায়।আর
নৌকা সাহায্যেই শুধু এটার কাছে পৌঁছানো যায়। এইসব ফিওর্ডের থেকেই ঊনবিংশ শতাব্দীর
মাঝামাঝি সময় থেকে নরওয়েতে পর্যটনের সূচনা হয়েছিল। উচ্চবিত্ত ইংরেজ ও জমিদাররা
নরওয়ের ফিওর্ডের প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য বাlandscape এ অভিভূত মুগ্ধ হয়েছিল যেখানে তারা
বড় বড় সালমান মাছ ধরতে পারত এখানকার নদী থেকে আর দূরের সমতল ভূমিতে চড়তে থাকা প্রাণবন্ত হরিণ শিকার করতে পারত।ইয়াচ করে তারা
ফিওর্ডের জলপথে ভ্রমণ করে বেড়াত আর ফিওর্ডের যেকোনো এক sideএ নোঙর ফেলত।তারা
সপ্তার পর সপ্তা বছরের পর বছর এখানে থেকে
বিলাসবহুল জীবনযাপন করত।
পরবর্তী বোর্ডে বোঝাল এখন
আমাদের ক্রুজ দুটো ছোট ফিওর্ডের মিলিত হয়ে একটা বড় ফিওর্ডের সৃষ্টির জংশনে।তারপর
দেখাল ফিওর্ড পরিবেশের পশুদের সম্বন্ধে বিবরণ। এখানকার চতুর্দিকের পরিবেশ, সমুদ্র
ও পাহাড়ের নান্দনিক দৃশ্য দেখে সহজেই
বিমুগ্ধ হওয়া যায়। কোন ভালো দিনে সীলদের
পর্বতের ওপর রোদ পোহাতে দেখতে পার। যখন তখন শুশুকের শরীরের
উপরিভাগ
ফিওর্ডের জলের ওপর ভেসে উঠতে দেখা যায়। তবে সব থেকে সুন্দর লাগে যখন তিমি খেলা
করতে আসে ফিওর্ডে।কখনও পর্বতের sideএ ছাগল লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে বেড়ায়, সবুজ জমি তে ভেড়া আর গরুদের হামেশাই চড়ে বেড়াতে
দেখা যায়। বন্য জন্তুদের মধ্যে হরিণ জাতীয় প্রাণী যেমন সাধারণ হরিণ, এলক্,
রেনডীয়ার সবসময় পর্বতের দুপাশের slopeএই দেখা যায়। ফিওর্ডের অধিবাসীদের
এগুলো অন্যতম খাবারের উৎস।
এর পরের display র contents
অনুবাদ করলে দাঁড়ায় এরকম: তুমি যদি কল্পনা করে থাক ফিওর্ডের মৃদু হাওয়ায় উঁচু
পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে সূর্যোদয় দেখতে দেখতে ও নদীর জলের কলকল ধ্বনি শুনতে শুনতে
সকালে জাগবে, তাহলে তুমি একা নও।1992 সালে
ডী কানিংহাম নামে একজন আমেরিকার অধিবাসী এই সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য 360মিটার উঁচুতে পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত
এখানকার স্টাইগেন ফার্ম কিনে নেন। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী এর কুঠিগুলোকে সংরক্ষণ করে এই ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদকে
প্রকৃতি প্রেমিক পর্যটকদের জন্যে রত্ন বা অত্যন্ত মূল্যবান সুবিধায় রূপান্তরিত করেন।এই ছোট পাহাড়ি ঘন সবুজ
জায়গায় মধ্যযুগ থেকে লোক থাকছে এবং বর্তমানে স্টাইগেন একটা ফিওর্ডে ঝাঁপ দেবার এক জনপ্রিয় জায়গা। রাতে
থাকার জন্যেও জায়গা দেওয়া হয়। অতিথরা এখানকার উত্তেজনাপূর্ণ সাংস্কৃতিক ইতিহাস
শিখতে পারে এবং প্রতিদিন সকালে পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশ্বঐতিহ্যবাহী চিত্তাকর্ষক
ফিওর্ড ভূচিত্রের অমূল্য দৃশ্য উপভোগ করতে করতে জাগতে পারে।

পরবর্তী displayতে জানানো হল আমরা এখন যেখানে পৌঁছাতে যাচ্ছি তার নাম
অরল্যান্ডসভ্যানজেন।এখানে পা রাখার সাথে সাথে অদ্ভুত প্রাকৃতিক শক্তির বিষয়ে
অভিজ্ঞতা অর্জন শুরু হ্য়।এখান থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা ফিওর্ড অথবা নরওয়ের
সবচেয়ে লম্বা সুড়ঙ্গ, ঘন সবুজ উপত্যকা এবং হিমবাহ দেখতে পার।


নদীর ওপর পারে হল উপত্যকায় সবুজের সমারোহের মাঝে ছোট ছোট বসতি।আর দুরে আরও উঁচুতে বরফাবৃত পাহাড়। কিছুদূর অন্তর উপত্যকা ভেদ করেসেখান থেকে নেমে আসছে ঝর্ণা আর মিশে যাচ্ছে নদীতে।এইসব দৃষ্টিনন্দন দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে প্রবল বেগে ছুটে চলেছে ট্রেন আমাদের আনন্দ দিতে দিতে। আর আমরা মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করতে করতে চলেছি। বলে রাখা ভালো এখানকার ট্রেনে ড্রাইভার, কন্ডাক্টর, গার্ড, টিটিই সব একই ব্যক্তি। কয়েকটা ছোট ঝর্ণা, ঝর্ণাদের crisscross এ তৈরী network অতিক্রম করার পর তিনি announce করলেন ট্রেন কয়েক মিনিটের জন্য থামবে রেল লাইন cross করে যাওয়া বিশেষ ঝর্ণার দৃশ্য আর তার গর্জন উপভোগ করার জন্য। অত্যুত্সাহী আমরা কয়েকজন নামধাম আর বাকিরা ট্রেনে বসেই জানলা দিয়ে উপভোগ করলেন।অসাধারণ এই চিত্তাকর্ষক দৃশ্য ভাষায় বর্ণনাতীত।এমন অভিভূত হয়ে দেখতে থাকলাম ট্রেন ছাড়ার সময়ের কথা মাথা থেকে বেরিয়ে গেল। ট্রেন ছাড়ার final whistle এর সঙ্গে সঙ্গে শঙ্কুবাবুর চিৎকার! দৌড়ে গিয়ে ট্রেনে উঠলাম। কিছুক্ষণ হাঁপিয়ে নিয়ে স্বাভাবিক হবার পর যখন ভাবলাম ট্রেন ছেড়ে গেলে কি হত! গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল, কারণ এখান থেকে tour operator আমায় ট্রেন ঘুরিয়ে ফেরত নিয়ে যেতে পারত না! আবার একবার মহান ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়ে জানলার দিকে মনোনিবেশ করলাম। অল্পক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম Myrdal। নামতে গিয়ে দেখি ঘন মেঘ আর বৃষ্টি পড়ছে ঝিরিঝিরি, স্টেশনটা ঘেরা বরফাবৃত পাহাড়ে। এই মায়াবী

পরিবেশে ট্রেন থেকে নামামাত্রই
শুরু হয়ে গেল ছবি তোলার হিরিক ট্রেন আর প্রকৃতিকে নিয়ে। বৃষ্টির তেজ বাড়তে শুরু
করলে ছাতা বের করতেই হল।কিছু ফটো ছাতাসহ তোলার পর আমরা ধীরে ধীরে একটা shade এর
নিচের বিশ্রাম হলে গিয়ে বসলাম। এখন অপেক্ষা ওসলোগামী পরবর্তী ট্রেনের জন্য। বসে
বসে আগের ট্রেন যাত্রার দৃশ্যগুলোর স্মৃতি রোমন্থন করছি , স্টেশনের wifi ব্যবহার
করে mobile খুট খুঁট করছি, দেখলাম ঢুকল
শঙ্কুবাবুর সতর্কতার message প্রস্তুত হবার জন্য-ট্রেন ঢুকছে।সঙ্গে সঙ্গে
আমরা একটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে লাইনের কাছে এসে দাঁড়ালাম।ট্রেনে উঠে দেখলাম কামরা
মোটামুটি ফাঁকা। Hardly চার পাঁচজন লোক এদিক ওদিক বসে আছে। ট্রেন ছাড়তেই আবার
শুরু হল প্রকৃতির নতুন লীলা আর চারিদিকে দেখি শুধু বরফের মেলা। শুরু হল আমাদের আবার দুদিকের জানলার দিকে ছোটাছুটি আর নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখার পালা। যতদূর চোখ যায় দেখি চারিদিকের প্রকৃতি শুধু বরফে বরফে সাদা।সমস্ত প্রকৃতি যেন সাদা আভরণ দিয়ে নিজেকে সুসজ্জিতা করে তুলেছে।

ভাসছে বড় বড় বরফের বড় বড় চাঁই।
কোথাও কোথাও বিশাল এলাকাজুড়ে পর্বতমালার সবুজের মাঝে মাঝে সাদা বরফের কার্পেট এক অদ্ভুত সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে। সব মিলিয়ে যেন এক স্বপ্নিল পরিবেশের মধ্যে দিয়ে
আমরা চলেছি যেন প্রকৃতির অমৃত রস পান করতে করতে। প্রায় পাঁচ-ছয় ঘন্টা যেন কেটে গেল
এক মধুর স্বপ্নের জগতে ।ট্রেন থামার সাথে সাথে ফিরে এলাম বাস্তবে।একে একে স্টেশন
থেকে নেমে অপেক্ষারত বাসে উঠে বসলাম। অচিরেই পৌঁছলাম দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক
সৌন্দর্যে ঘেরা এক বড় হোটেলে।তখন বাজে প্রায় সন্ধ্যা সাড়ে আটটা। হোটেলের ঘরে ঢোকার
আগেই করে নিতে হল নৈশভোজ সময় প্রায় অতিক্রান্ত হওয়ায়। সারাদিনের ক্লান্তিকর যাত্রাশেষে fresh হয়ে ক্যামেরা ও মোবাইলগুলো চার্জে বসিয়ে পরের দিনের
জন্য পোশাক ও ব্যাগ ready করে বিছানা নেবার সাথে সাথে শেষ নরওয়ের ফিওর্ড কেন্দ্রিক প্রাকৃতিক
সৌন্দর্য দর্শন ও তথ্য সংগ্রহ। প্রধানতঃ ফিওর্ডের অভিজ্ঞতার জন্যই পরিকল্পনা
করেছিলাম এই স্ক্যানডেনিভিয়ান দেশগুলোতে বেড়ানোর। সেই উদ্দেশ্যে সন্তোষজনকভাবে সফলএবারের পর্বের বর্ণনা
তুলনামূলকভাবে একটু বাড় হয়ে গেল। লেখাটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছবি follow করলে পুরো
কাহিনীটা ভালো করে visualise ও উপভোগ করা যাবে আশা করি। আজ তবে এইটুকু থাক।












মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন