স্ক্যানডেনিভিয়া ভ্রমণ (প্রথম পর্ব) 





















স্ক্যানডানিভিয়া ভ্রমণ (প্রথম পর্ব)

আমার ছেলের বয়স তখন নয় বা দশ।পড়ে class IV বা V এ। একদিন আমার স্ত্রী ওকে রোজকারের মত সন্ধ্যায় পড়াতে বসেছে। বিষয় হল ভৃগোল। বিভিন্ন প্রকারের ভূমি বা landform পড়ানোর সময় একটা term আসে frjods (ফ্রিওডস্)।হিমশৈল যখন দুটো পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে বয়ে যায় তখন জমি কাটতে কাটতে ভীষন গভীর অথচ সরু channel এর সৃষ্টি করে।এর গভীরতা এতটাই যে মাঝারি আকারের জাহাজ সহজেই এর মধ্যে দিয়ে যাতায়াত করতে পারে।প্রধানত: ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও নরওয়েতে এই ফ্রিওডস্ দেখা যায়। ফ্রিওডসের উৎপত্তি ও বর্ণনা শোনার পর শিশু সরল মনে মাকে প্রশ্ন করে বসল "মাম্ মাম্, আমরা কবে ফ্রিওডস্ দেখতে যাব?" একটু হকচকিয়ে গিয়ে তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে আমার স্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল-"সোনা, সময় সুযোগ হলে আমরা ঠিক তোমায় ফ্রিওডস্ দেখতে নিয়ে যাব।"

     প্রায় ১৮/১৯ বছর পর ছেলের বয়স যখন ২৭ ছুঁই ছুঁই, আমাদের সংসার অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট সক্ষম, আমার স্ত্রীর চোখ আকর্ষন করে কলকাতার এক ভ্রমণ কম্পানির বিজ্ঞাপন। সেখানে ফ্রিওডস সহ পাচঁটা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশের (ফিনল্যান্ড, এস্তোনিয়া, সুইডেন, নরওয়ে ও ডেনমার্ক) নির্বাচিত দর্শনীয় স্থান ভ্রমনের হাতছানি ছিল। ভ্রমনের সময়সীমা ছিল দুসপ্তাহ যেটা আমার শিক্ষিকা স্ত্রীর গরমের ছুটির মধ্যে হওয়াতে আমাদের আগ্রহ আরো বাড়ল, আর ছেলেকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের আনন্দ আমাদেরকে ভ্রমনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করল। একদিন ভ্রমন কোম্পানির কার্যালয়ে গিয়ে নির্দিষ্ট ফর্ম পূরণ করে অগ্রিম টাকা জমা দিয়ে ২৫জনের দলে আমাদের তিনজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করে এলাম।আসা যাওয়ার টিকিট, খাওয়া-দাওয়া, থাকা, travel insurance , Visa-fee ইত্যাদি  সবকিছুর দায়িত্ব ছিল ওই ভ্রমন কোম্পানির। ধীরে ধীরে Air ticket, accommodation booking, visa-interview সবই হয়ে গেল। ভ্রমন শুরুর তারিখের সপ্তাহখানেক আগে হাতে এল  Schengen Visa. আমরা যাত্রার জন্য আনুসঙ্গিক সামগ্রী জোগাড় করতে করতে ক্রমশ: নিজেদেরকে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে থাকলাম। যাত্রা শুরুর কয়েকদিন আগে একটা রেস্তোরাঁ তে ছোট সভায় মধ্যাহ্নভোজ সহকারে আমাদেরকে কোম্পানির তরফ থেকে সংক্ষেপে ভ্রমন সক্রান্ত প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হল। অবশেষে চলে এল যাত্রা শুরুর বিশেষ দিন। আমরা তিনজন রাত এগারোটা নাগাদ ট্যাক্সি ভাড়া করে বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। কাতার এয়ারলাইন্সের বিমান ছাড়ার সময় ছিল ভোর তিনটে পঁয়তাল্লিশে। বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করে, ইমিগ্রেশন ও সিকিউরিটি চেকের পর দেড়টা'র মধ্যে lounge এ পৌঁছে গেলাম। উচ্চশ্রেণীর ক্রেডিট কার্ডের দৌলতে International lounge এ গিয়ে আরাম করা আর পেট ভর্তি করে চব্য চোষ্য ভোজনের সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করলাম। অবশেষে family photo session সেড়ে আমরা বিমানের মধ্যে নির্দিষ্ট seat এ গিয়ে বসলাম। সৌভাগ্যবশত: আমাদের তিনজনের সিট পাশাপাশি পড়েছিল। বিমানের মধ্যেই আমাদের দলের অন্যান্য অনেকের সঙ্গেই আলাপ হল। ছাড়ার মূহুর্তে অদ্ভুত এক আনন্দে ও উত্তেজনায় শরীরটা কেঁপে উঠলো । পৌনে চারটের সময় কাতারের দোহামুখী বিমান ছাড়ার পর থেকে seat টাকে পিছনে হেলিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছিলাম কিন্তু লাভ হয়নি। ঘন্টাখানেক এইভাবে চোখ বোজা খোলা করতে করতে হঠাৎ জানলার দিকে চোখ যেতেই চমকে উঠলাম। পূর্ব দিকের আকাশে তখন শুরু হয়ে গেছে রঙের আবির  খেলা। মূহুর্তে মূহুর্তে পরিবর্তন হচ্ছে রঙের আর মুগ্ধ হয়ে আমি সেই অপরূপ নয়নাভিরাম দৃশ্য উপভোগ করছি। দিগন্তের এই বর্ণাঢ্য পরিবেশে ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল কমলা রঙের আভা যার কিছুটা সময়ের তালে তালে ক্রমশ: রূপান্তরিত হল লাল রঙের ছটায়।পূর্ব ভুবনের মুখ যেন রবির আবির্ভাব বার্তায় হঠাৎ চমকে উঠে লজ্জায় লাল হয়ে গেল! ভোরের আকাশের ছড়ানো আবীরের মধ্যে দিয়ে আবির্ভূত হয়ে সমগ্র পৃথিবী আলোকিত করে সূর্যদেব সুপ্রভাতের ঘোষণা করলেন। ততক্ষণে আমরা দোহার পথে অর্ধেক রাস্তা অতিক্রম করে ফেলেছি। ভোরের আকাশের অপরূপ দৃশ্য অবলোকন করতে করতে চোখে একটু ক্লান্তি নেমে এল। কিছুক্ষণের মধ্যে গভীর নিদ্রা আমায় গ্রাস করে ফেলল।ঘুম ভাঙ্গলো প্রাত:রাশ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিমান সেবিকার কন্ঠস্বর ও স্পর্শে।তড়িঘড়ি করে seat সোজা করে খাবার টেবিল পেতে নিলাম। ফলের রস সহকারে প্রাত:রাশ সম্পন্ন করে আবার নিদ্রামগ্ন হয়ে পড়লাম। যাত্রীদের হুড়োহুড়িতে ঘুম ভাঙ্গলো । বুঝলাম আমাদের বিমান দোহা বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে আর নামার সময় আসন্ন।কেবিন থেকে নিজ নিজ ব্যাগ সংগ্রহ করে বিমানের দরজা দিয়ে বেরিয়ে দোহা বিমানবন্দরে immigration check ও security check হয়ে যাবার পর হেলসিংকি যাবার বিমান ছাড়ার গেটের দিকে এসে lounge এ বসলাম ।অসম্ভব বড় এই দোহা বিমান বন্দর। বন্দরের মধ্যে দিয়েই চলছে যাত্রী পরিবহনকারী টিউব রেল। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যাবার জন্য অসংখ্য গেট। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর শুরু হল boarding. কাতার airwaysর হেলসিংকি অভিমুখী বিমানে চড়ে বসলাম। এবার ও আমাদের তিনজনের একসঙ্গে seat পড়েছিল তবে কোন window seat ছিল না।এই বিমানে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার ও পানীয়র ব্যবস্থা ছিল । নতুন ধরনের সুস্বাদু খাবার ও red wine উপভোগ করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম খেয়াল নেই।ঘুম ভাঙ্গলো বিমান সেবিকার বিমান অবতরণের ঘোষণায়। নির্ধারিত belt থেকে suitcase সংগ্রহ করে immigration এর line এ দাঁড়িয়ে পড়লাম। Immigration clearance পেতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগল। বেরিয়েই যে যার স্যুটকেস নিয়ে অপেক্ষারত বাসের দিকে অগ্রসর হলাম। বাসচালক হাসিমুখে আমাদের স্বাগতম  জানালো। বাসের নীচের দিকে যে যার suitcase load করে আমরা seat দখল করে বসে পড়লাম। যাত্রী সংখ্যা থেকে দ্বিগুণের বেশী seat থাকায় ইচ্ছামতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরাম করে বসলাম।বাস ছাড়ার 5 থেকে 10 মিনিটের মধ্যেই এসে গেল আমাদের থাকার জন্য book করা Scandic হোটৈল।সবার থাকার ঘর পূর্ব নির্ধারিত ছিল। Reception desk থেকে চাবি নিয়ে যে যার ঘরে চলে গেলাম fresh হতে।তখন হেলসিংকিতে সময় প্রায় 5.30pm. পরিষ্কার নীল আকাশ আর ঝলমলে রোদ দেখে মনে হচ্ছে যেন কলকাতার দুপুর!  আমাদের সঙ্গী পরিচয়ের প্রতিনিধি নির্দেশ দিলেন নৈশভোজে যাবার জন্য বাস ছাড়বে 6.30 pm এ। তাড়াতাড়ি fresh হয়ে সময়মতো এসে আবার বাসে এসে জায়গা নিলাম। ফিনল্যান্ড হল পৃথিবীর সবচেয়ে পরিষ্কার pollution free দেশ।জানলা দিয়ে চারিদিকে নজর ঘোরাতেই তার নিদর্শন চোখে পড়ল। বাস ছাড়তেই সেই সব অপরূপ দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করার জন্য আমাদের সকলের mobile ও DSLR ক্যামেরা সচল হয়ে উঠল। মাখনের মতো রাস্তা দুপাশে কখনও প্রাকৃতিক বন রাশি, সুন্দর সেতু, স্বচ্ছ জলরাশি, কখনো বিশেষ ধরনের অট্টালিকা, disciplined যানবাহন ভেদ করে এগিয়ে চলেছে আমাদের luxury বাস আর আমরা উপভোগ্য ক্রছি প্রাণভরে Helsinki শহরের পরিবেশ আর অনর্গল চলছে mobile ও DSLR ক্যামেরার যুগলবন্দী। রাস্তায় কলকাতার মতো ট্রাম চলতে দেখে বিশেষভাবে উত্তেজিত হয়ে পড়লাম। দাঁড়িয়ে থাকা ট্রামের ছবি, চলন্ত ট্রামের video ক্যামেরাবন্দী করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।তবে এখানকার ট্রামের frequency আর যাত্রী সংখ্যা দেখে বুঝলাম ট্রাম এখানে আমাদের মতো শুধু joy ride হিসাবেই ব্যবহৃত হয় না।এটা নিত্য যাত্রীদের বিভিন্ন কাজে যাওয়ার জন্য অন্যতম বাহন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের বাস একটা প্রবাসী ভারতীয় রেস্তোরাঁর সামনে এসে আমাদের নৈশভোজের জন্য নামালো।আরো একটা জিনিষ অবাক করল প্রায় 40 min journey তে সমগ্র রাস্তায় একটাও গাড়ীর হর্ণের আওয়াজ শুনতে পেলাম না।যতটা উৎসাহ নিয়ে ভারতীয় রেস্তোরাঁয় খাবার জন্য ঢুকেছিলাম খাবার খেতে গিয়ে ততটাই হতাশ হলাম। মেন্যু আমাদের পরিচিত কিন্তু এমন উপকরণ দিয়ে তৈরী আমরা তৃপ্তিভরে খেতে পারলাম না।আটটার মধ্যে শেষ হয়ে নৈশভোজে কিন্তু চারিদিকে রোদ ঝলমল করছে। সূর্যদেব পশ্চিম আকাশের দিকে একটু ঢলে পড়ে পুরো শহরটাকে এখনো উদ্ভাসিত করে রেখেছেন।সাড়ে আটটায় হোটেলের ঘরে ফিরে আসতেই ক্লান্তি যেন সমস্ত শরীরকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।পরের দিন আবার cruise এ Estoniaতে day trip আছে, তাই portable bag গুছিয়ে রেখে, mobile ও ক্যমেরার battery চার্জে বসিয়ে রাত্রির পোষাকে নরম গদিওলা আরামদায়ক বিছানায় শরীরটাকে এলিয়ে দিলাম।তখন ও বাইরে অনেক আলো।শুয়ে শুয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকলাম উৎসুক হয়ে জানার জন্য কখন অন্ধকার নেমে আসে! সূর্যদেব অস্ত যাওয়ার পর যখন অন্ধকার নেমে এল তখন ঘড়িতে প্রায় রাত এগারোটা। আমার ও ক্লান্ত চোখ আর বেশীক্ষণ খোলা থাকতে পারল না। অচিরেই গভীর নিদ্রা আমায় আচ্ছন্ন করে ফেললো।

Estonia Day trip (এস্তোনিয়া দিবা ভ্রমণ)

পরের দিন একটু সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হল।কারণ Estonia র রাজধানী Tallin এ আছে cruise এ করে day trip. ইউরোপে প্রথম আন্তর্জাতিক  জাহাজ যাত্রার কথা ভেবে মনে এক অদ্ভুত উত্তেজনা! হোটেলের dinning হলে complementary প্রাতরাশ করতে এসে মন ভরে গেল! অজস্র ধরনের নানারকম খাবার! মধ্যাহ্নভোজের অনিশ্চয়তার কথা ভেবে ঘুরে ঘুরে পেটপুর্তি করলাম এশিয় ও ইউরোপীয় খাবারের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে। তারপর আমাদের বাস হেলসিংকি শহরের সবুজের সমারোহ ভেদ করে অতি মসৃণ ও পরিচ্ছন্ন রাস্তার ওপর দিয়ে ছুটে চলল হেলসিংকি সামুদ্রিক বন্দরের দিকে। বন্দরের সামনে যেখানে আমাদের বাস নামাল, সেখানকার শহরের infrastructure এ মোহিত হয়ে শুরু হয়ে গেল একের পর এক দৃশ্যকে camera বন্দী করার প্রয়াস। অপরদিকে আমাদের tour operator এর প্রতিনিধি শঙ্কুবাবু চলে গেছেন সকলের জন্য boarding pass সংগ্রহ করতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা তার কাছ থেকে নিজ নিজ pass হাতে নিয়ে বন্দরের প্রবেশদ্বার অতিক্রম করে ঢুকলাম জাহাজ বন্দরের ভেতর। অপেক্ষারত বহু যাত্রীর মাঝে তখন তিল ধারণের জায়গা নেই। এদের মধ্যেই আমাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরে নিজেদেরকে ধন্য মনে করলাম। বসার জায়গা খুঁজতে খুঁজতে একটা বেঞ্চের এক কিনারায় অত্যন্ত স্থূলকায় এক ইউরোপীয়ান মহিলার পাশে কোনরকমে পেছন ঠেকালাম। ওদিকে আমার ছেলে আর বৌ দেখি আমার দিকে ইঙ্গিত করে খুব হাসাহাসি করছে। ইশারায় বলছে মহিলা একটু গা ঝাড়া দিলেই আমি বেঞ্চ থেকে পড়ে যাব। ওদের এই ব্যঙ্গ শুনে একটু মেঝের সঙ্গে পায়ের support শক্ত করে নিজেকে সুরক্ষিত করলাম। অবশ্য বেশীক্ষন আর চাপ নিতে হল না। ওদিকে জাহাজে boarding শুরু হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার পর্যটকদের সঙ্গে পা মিলিয়ে উঠতে উঠতে দেখি পৌঁছে গেছি একটা bar cum restaurant এ। কিছুক্ষণ পরে ধাতস্থ হবার পর বুঝলাম এটা আমাদের জাহাজ Viking এর ই আমোদ প্রমোদের জায়গা। একটা খালি চেয়ার পেয়ে উপবিষ্ট হয়ে অনর্গল চলতে থাকা নাচগান দেখে কিছুটা সময় কাটল। উন্মুক্ত ডেকে যাবার জন্য মন উসখুস করছে। এদিকে বাইরে তখন চলছে প্রবলবেগে হাওয়া।গরম কাপড়ের হুডি দিয়ে মাথাসহ শরীরের উপরিভাগ আবৃত করে ডেকে এসে চারপাশের দৃশ্য দেখে মন জুড়িয়ে গেল। সমুদ্রের মধ্যে দিয়ে এক সাদা ফেনার রেখা তৈরী করে ঢেউ কেটে এগিয়ে চলেছে আমাদের বিশালকায় জাহাজ Viking আর আশে পাশে উড়ে বেড়াচ্ছে অসংখ্য sea gull! চলমান জাহাজের তালে তালে উড়ছে আর মাছ স্বীকার করছে।দূরে ছোট ছোট speed boat দুর্নিবার গতিতে ছুটে চলেছে। বহুদূরে দেখা যাচ্ছে ছোট ছোট দ্বীপ।সব মিলিয়ে যেন এক নয়নাভিরাম দৃশ্য। জাহাজের ডেকে অচিরেই শুরু হয়ে গেল বিভিন্ন position এ ও pose এ ফটো তোলার ধুম। চারিপাশে প্রচুর পর্যটক পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের।কেউ অনর্গল ধুমপান করে যাচ্ছে চোখ জুড়ানো দৃশ্য দেখতে দেখতে।কেউ বা উপভোগ করছে  বার থেকে নিয়ে আসা beer/whiskyর পেগ এর সাথে। আমরা photo session র পর গা হেলিয়ে দিলাম আরাম কেদারায় চলমান জাহাজের ডেকে ঠাণ্ডা হাওয়ায় খোলা সম্পূর্ণ পরিচ্ছন্ন নীল আকাশের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে। কিছুক্ষণের মধ্যে বেড়ে গেল হাওয়ার গতিবেগ। অগত্যা ফিরে আসতে হল আমাদের resturant cum bar এর entertainment hallএ। সেখানে বসার আসন দখল করার পর দেখলাম এক দম্পতি already আসর জমিয়ে দিয়েছে।DJ এর একের পর এক গানের তালে তালে তাদের steps এ যেন নৃত্যমঞ্চে উঠেছে ঝড়। উপস্থিত সমস্ত পর্যটক দর্শক ও যেন সেই ঝরে ভেসে গিয়ে তাদের সঙ্গে পা মেলাতে মেলাতে আনন্দে মাতোয়ারা।এই অপরিসীম আনন্দের মধ্যে দিয়ে সময় কাটাতে কাটাতে কখন যে Tallinn বন্দরের কাছে এসে গেছি বুঝতেই পারিনি।বিশাল লাইন করে সমস্ত পর্যটকদের সঙ্গে আমরা ইউরোপের আর এক নতুন দেশ Estonia র মাটিতে পা রাখলাম।Travel company র প্রতিনিধি শঙ্কুবাবুকে অনুসরণ করে আমরা অপেক্ষারত বাসে উঠে seat দখল করলাম।বাস আমাদের নামাল তারিন শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে। সেখান আমাদের guide হিসাবে যোগদান করলেন একজন বয়স্কা মহিলা। তিনি আমাদের ঘোরাতে শুরু করলেন Estonia র ইতিহাস শোনাতে শোনাতে।Estoniaর অবস্থান উত্তর ইউরোপে বাল্টিক সাগর ও গাল্ফ অফ ফিনল্যান্ডের মাঝখানে। রাশিয়া, ডেনমার্ক, সোভিয়েত ইউনিয়ন বিভিন্ন সময়ে এইসব দেশের অধীনে থাকার পর 1991 সালে পূর্ণ স্বাধীনতা পায়। বর্তমানে একটা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে চালিত দেশ।প্রায় ১৫০০টা দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই দেশ।এই ছোট্ট দেশের রাজধানী একটা সাজানো গোছানো সুন্দর শহর হল Tallinn.বড় বড় castle, উঁচু উঁচু দুর্গ,বড় বড় গীর্জা, পাথুরে সমুদ্র সৈকত  হল এই শহরের প্রধান বৈশিষ্ট্য।বিশাল botanical garden থেকে শুরু করে বিখ্যাত গির্জা, প্রাসাদ, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির বাড়ি হয়ে পাথরের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা একটা সুন্দর view point এ এসে পৌঁছলাম। সেখান থেকে বিভিন্ন দ্বীপ,সমুদ্র সৈকত, বড় বড় প্রাসাদের চূড়া ও ত্যালিন শহরের মিশ্রিত মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে করতে বুঝতেই পারিনি ফেরার সময় হয়ে গেছে! শঙ্কুবাবু যথারীতি তাড়া দিতে শুরু করেছে! দিলে কি হবে? Tallin শহরের এই সমস্ত নয়নাভিরাম দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি না করে আর স্মারণিক সংগ্রহ না করে কি যাওয়া যায়? শঙ্করবাবুর তৃতীয় warning এর পর যখন মনে হল আর দেরী করলে ফেরার cruise miss হয়ে যাবে তখন আমরা photo shoot আর কেনাকাটায় ইতি টেনে বাসের উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করলাম। সবাই এসে গেলে বাস রওনা দিল বন্দরের দিকে। বন্দরে এসে দেখি যে Viking জাহাজে এসেছিলাম, সেই জাহাজটাই  আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আমাদের মধ্যে কেউ বসল entertainment হলে, কেউ আবার আর বসলাম বিভিন্ন তলার ডেকে। ডেকে কেউ ব্যস্ত afternoon walk এ, কেউ আরামকেদারায় গা হেলিয়ে ব্যস্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে, কেউ বা railing ধরে দাঁড়িয়ে আপন মনে সমুদ্রের মধ্যে speed boat ও জাহাজ, দূরে কোন দ্বীপ এবং জাহাজের তালে তালে উড়ন্ত sea gull এর আনাগোনা দেখতে দেখতে মশগুল, কেউ ব্যস্ত যথাসম্ভব নিজেদের সহ সমস্ত প্রাকৃতিক দৃশ্যকে ক্যামেরাবন্দি করে রাখতে,  আবার কেউ ব্যস্ত mobile নিয়ে। হলের ভেতর আবার জমে উঠেছে নাচ গানের আসর। সস্ত্রীক আমি ও বেশীর ভাগ সহযাত্রী হলের ভেতর গিয়ে চেয়ার টেবিল দখল করে বসলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই DJর গানের তালে তালে আবার dance floor মাতিয়ে তুলল, সকালের সেই দুজন ইউরোপিয়ান দম্পতি। ধীরে ধীরে তাদের সঙ্গে আরো অনেকে পায়ের ছন্দ মিলিয়ে আরো জমিয়ে তুলল আসর।কিছুক্ষণ অন্দরমহলের আনন্দ নেবার পর ডেকে বেড়িয়ে এসে দেখি আমাদের সঙ্গে একা আসা সহযাত্রী রায়বাবু এক কোণে বসে নিরালায় অন্য মজা নিতে ব্যস্ত। লুকিয়ে আনা বোতল খুলে বেলাগাম মদ্যপান করে চলেছেন।আমাকেও সঙ্গ দেবার জন্য ডাকলেন। কাছে গিয়ে দেখলাম ওনার টালমাটাল অবস্থা। উঠে দাঁড়িয়ে ভারসাম্য রাখতে পারছেন না।অনেক বুঝিয়েও বিরততো করতে পারলাম না, গালি খেয়ে ভেতরে চলে এলাম। এদিকে অন্দরমহলের আসর ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। জাহাজ বন্দরে ঢোকার মুখে। শুরু হয়ে গেছে শঙ্কু বাবুর তাড়া দেবার পর্ব। জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে freshহয়ে ছেলে বৌকে নিয়ে জাহাজ থেকে নামার জন্য তৈরি এমনসময় ডেক থেকে ভেসে এল চেঁচামেচির শব্দ। শঙ্কুবাবু খুব রেগে গিয়ে চিৎকার করছেন। সহযাত্রীর কাছে জানতে পারলাম রায়বাবুকে তৈরি হয়ে নামার জন্য তাড়া দিতে গিয়ে শঙ্কুবাবু দেখেন, রায়বাবু অত্যধিক মদ্যপানের দরুন সম্পূর্ণ ভারসাম্য হারিয়েছেন আর দাঁড়াতে গিয়ে বারবার পড়ে যাচ্ছেন।তাই শঙ্কুবাবু স্বাভাবিকভাবেই মেজাজ হারিয়েছেন।মহিলা মহলেও বেশ সোরগোল পড়ে গেছে। অনেকেই এই সহযাত্রীর সঙ্গে বাকি সফরে নিজেদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত দুশ্চিন্তা নিয়ে চর্চা শুরু করে দিয়েছেন, আর শঙ্কু বাবু তখন রায়বাবু কে জাহাজ থেকে নামানোর উপায় বার করতে চরম মানসিক চাপে। অবশেষে জাহাজের অন্য সব যাত্রীরা নেমে গেলে , আমরা সব পুরুষ যাত্রীরা মিলে ওনাকে ধরাধরি করে নামিয়ে বাসে বসিয়ে দিয়ে শঙ্কুবাবুকে দুশ্চিন্তা থেকে নিষ্কৃতি দিলাম। হেলসিঙ্কি সমুদ্র বন্দর থেকে শঙ্কুবাবু আমাদের সোজা নিয়ে চলে গেলেন dinner করাতে এক ভারতীয় রেস্তরাঁয়। অদ্ভুত লাগছিল, দিনমণি তখনও পশ্চিম আকাশে স্বমহিমায় বিরাজ করছেন অথচ ঘড়ির কাঁটায়  তখন 8.00pm. ইউরোপের এই ভারতীয় রেস্তরাঁয় দুদিন খাবার অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারলাম আইটেম এর নামগুলোই শুধু ভারতীয় কিন্তু স্বাদে গন্ধে একদমই আলাদা আর আমাদের রুচিসম্মত নয়।খিদের মুখে সেই  খাবার গোগ্রাসে গিলে বাসে করে রওনা দিলাম হোটেলের দিকে। হোটেলের ঘরে ঢুকেই কোন  রকমে মোবাইল ও ক্যামেরা recharge করতে বসিয়ে ক্লান্ত শরীরে বিছানায় নিজেকে সমর্পণ করে গভীর নিদ্রায় ঢলে পড়লাম। আর স্ক্যানডেনিভিয়া ভ্রমণের স্মরণীয়  ঘটনাবহুল প্রথম দিনের পরিসমাপ্তি ঘটল।পরের দিন হেলসিঙ্কি শহর পরিদর্শন করে cruise এ ভ্রমণ Stockholm এর উদ্দেশ্যে।
























 

 

 

 

 

 

 


 

 

 

 

 

 

 

 

                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                         

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

Scandinavia-2

কাফেরগাঁও ভ্রমণ