স্ক্যানডিন্যাভিয়া-পঞ্চম


                                                           
                                            স্ক্যানডিন্যাভিয়া-পঞ্চম


আজ ও বেশ তাড়া তাড়াতাড়ি উঠে তৈরি হতে হল।বাস ছুটে চলল আর এক অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা শহর জাইরাঙ্গারের দিকে। রাস্তার দুপাশের চোখ জুড়ানো তৃণভূমি যেন ঢেউ খেলানো জমির ওপর পাতা সবুজ কার্পেট। কখনো সর্পিল রাস্তা এঁকে বেঁকে ছুটে চলেছে গভীর  ঝাউবনকে ভেদ করে।কোথাও রাস্তার ধারে বয়ে চলেছে খরস্রোতা নদী দুরন্ত বেগে অদ্ভুত জলতরঙ্গ সৃষ্টি করে। অপর পারে বিস্তীর্ণ তৃণভূমি দূরে মিশেছে গভীর বনরাশির সঙ্গে উঁচু পর্বতমালার পাদদেশে।                                                                                                                                         

  
সবমিলিয়ে এই অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতে বেশ কিছুক্ষণ চলতে থাকলাম। এরপর শুরু হয়ে গেল পাহাড়ি এলাকা। পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলেছে আমাদের বাস ।মাঝখানে সরু অথচ গভীর নদীর মধ্যে দিয়ে চলমান এক মাঝারি সাইজের জাহাজ। প্রথম পর্বে লিখেছিলাম এই ধরনের নদীকেই বলে ফ্রিওডস।আর ছেলেকে ছোটবেলায় দেওয়া ফ্রিওডস দেখানোর প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্যই স্ক্যানডেনিভিয়াতে বেড়াতে আসা। 
  জাইরাঙ্গারের দিকে যেতে যেতে এই রাস্তায় চলমান বাস থেকে  দেখার সৌভাগ্য  হল প্রথম  ফ্রিওডসের।
 আমরা সবাই অভিভূত ও যার পর নাই আনন্দে ভেসে গেলাম। অপরদিকে  তখন মাঝে মাঝে  চোখে পড়তে শুরু করেছে অল্প স্বল্প বরফে ঢাকা পাহাড়। পাহাড়ি রাস্তা অতিক্রম করে বাস যত এগিয়ে চলেছে পর্বতমালার ওপর বরফের মাত্রা তত বেড়ে চলেছে আর আমরাও ক্রমশঃ উত্তেজিত হয়ে পড়ছি,  কখনো ডান দিকের জানলা, কখনো বাঁদিক আবার কখনও সামনে মোবাইল আর ক্যামেরা নিয়ে সবার ছুটোছুটি শুরু হয়ে গেল বাসের মধ্যে।  ইতিমধ্যে আমরা প্রবেশ করে গেছি সম্পূর্ণ বরফে ঢাকা পাহাড়ি এলাকায়।   চারিদিকের পর্বতমালা বরফের  বরফে সাদা । সে এক অপরূপ দৃশ্য। বরফের সমারোহ ভেদ করে যেতে যেতে আমাদের বাস একদম বরফাবৃত  এক পাহাড়ের একবারে চূড়ায় নিয়ে গিয়ে থামল। সেই view   pointথেকে চারিদিকে যতদূর চোখ যায় বরফে ঢাকা। এক কথায় নয়নাভিরাম দৃশ্য  আর ভাষায় বর্ণনাতীত। চারিদিকে ঘুরে আমরা যে বিভিন্ন pose এ ফটো সেসন  করলাম সেকথা বলাই বাহুল্য। যতই ফটো নিই আশা আর মিটছে না শেষ পর্যন্ত শঙ্কুবাবুর তাড়ায় সেসনে ক্ষান্ত দিয়ে বাসে উঠলাম। এ এক বিরল দৃশ্য আর অভিজ্ঞতা! জন্ম জন্মান্তরেও ভুলব না।                                                                      
                                                                 

         
                                                                                                                                              
    
                                                                                                                                                                                                                                             
এরপর আমরা  সারা রাস্তা চলমান বাস থেকে বরফ ঢাকা পাহাড়ের মনোরম দৃশ্য দেখতে দেখতে নেমে এলাম একটা ফ্রিওডস cruise স্টেশনে যেখান থেকে শুরু হবে আমাদের বহু আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্নিল ক্রুজ যাত্রা। তার আগে আমাদের কিছুক্ষণ ফ্রি সময়  দেওয়া হল ।আমরা souvenir এর দোকানে পছন্দমতো কিছু কেনাকাটা, হালকা স্ন্যাকস সেবন করে ও এদিক ওদিক  ফটো তুলে সময়ের সদ্ব্যবহার করলাম। কিছুক্ষণ পর দেখলাম   একটা passenger    ও গাড়িভর্তি cruise এই স্টেশনের দিকে আসছে। একে একে সব passenger ও গাড়ি নেমে যাবার পর আমাদের বোর্ডিং শুরু হল ওই একই cruise।বাস আমাদের ছেড়ে চলে গেল আমাদের জন্যে অপেক্ষা করবে ফ্রিওডস এর অপর প্রান্তের stationএ।দুপাশের পাহাড়ের মাঝখানে ফ্রিওডস জলপথ দিয়ে কিছুদূর যাওয়ার পরই উন্মুক্ত হল অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।                                                                               
  
 বাস আমাদের ছেড়ে চলে গেল, আমাদের জন্যে অপেক্ষা করবে ফ্রিওডস এর অপর প্রান্তের stationএ।দুপাশের পাহাড়ের মাঝখানে ফ্রিওডস জলপথ দিয়ে কিছুদূর যাওয়ার পরই উন্মুক্ত হল অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।  দুপাশের পাহাড় দিয়ে সবুজের সমারোহ ভেদ করে নেমে আসছে অসংখ্য প্রাকৃতিক ঝর্ণা। এইসব দৃশ্য নির্ভেজালভাবে উপভোগ করার জন্য মুক্ত ডেকে ভিড় জমে গেল।আমিও সেই ভিড়ে সামিল হয়ে একটা মনমতো জায়গায় ডেকের একধারে নিজেকে দাঁড়  করালাম।একটাও spot আর মূহুর্ত miss করা চলবে না! 
                                                       
    
                                                                                                                                                      কিছুক্ষণ এইভাবে চলার পর যখন আমাদের cruise seven sisters water falls এর কাছে এল তখন সেই দৃশ্য দেখে সমস্ত ট্যুরিস্ট আনন্দ উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল।চারশ দশ মিটার লম্বা একটা ঝর্ণা এখানে সাত ভাগে বিভক্ত হয়ে নীচে নেমে আসছে। এর মধ্যে সবচেয়ে লম্বা streamটার free fall হল 250 m.বিভিন্ন angle থেকে যতক্ষণ seven sisters কে দেখা গেছে চোখ, mobile/camera একটুও বিরাম পায়নি।  কত যে ছবি তুলেছি ঝোঁকের মাথায় তার কোন ইয়ত্তা নেই। এরপর বাকি journey টা ভিতরের seating area তে এক জানলার ধারে বসে উপভোগ করলাম।                         
    
                                                                                                 অল্পক্ষণের মধ্যে আমাদের cruise এপারের stationএ এসে  যখন নামল তখন বিকেল হয়ে গেছে। একে একে ক্রুজ থেকে নেমে অপেক্ষারত বাসে উঠে seat দখল করলাম।  বাস যখন চলতে শুরু করল, দুপাশে চেয়ে দেখলাম -পাহাড়ের চূড়ার বরফে অস্তগামী সূর্যের আলোর রশ্মির প্রতিফলনে প্রকৃতিতে অদ্ভুত রঙের খেলা। রাস্তার ধারের বিশাল lake এর পাশ দিয়ে যখন যাচ্ছি ,অতি স্বচ্ছ লেকের জলের মধ্যে ভেসে উঠছে বরফাবৃত পাহাড়, বনরাশি, অস্তগামী সূর্যের মিশ্রিত রঙিন প্রতিবিম্ব। এই সমস্ত নয়নাভিরাম দৃশ্য মনে সৃষ্টি করল অদ্ভুত অনুভূতির।চলে গেলাম যেন স্বপ্নের জগতে। হঠাৎ দেখলাম এসে গেছে আমাদের গন্তব্যস্থল পরবর্তী হোটেল। চেক ইন করেই বেরিয়ে পড়লাম চারিদিক survey করতে। অসাধারণ ambience !হোটেল চত্বরেই আছে একটা লেক আর boating করার ব্যবস্থা। যতদূর চোখ যায় জল দেখছি, লেকের শেষ দেখা যাচ্ছে না।মনে হলো এই লেকের ধার দিয়েই হয়তো অপরূপ সুন্দর দৃশ্য দেখতে দেখতে এসেছি! হোটেল চত্বর থেকে দেখা যাচ্ছে লেকের এক তীরে বিস্তীর্ণ তৃণভূমির মাঝখানে সুন্দর নক্সার এক বাড়ি। অপর পারে সোজা উঠে গেছে এক বরফাবৃত পাহাড়। কিছুক্ষণ লেকের জেটিতে সময় কাটিয়ে হোটেলের ভেতর যাবার পর পরই সময়  হয়ে গেল নৈশভোজের। নৈশভোজের সময় একটা intersting ঘটনা ঘটল। ঘর থেকে ফ্রেশ হয়ে dining হলে আসতে একটু দেরী হয়েছিল আমাদের। এখানেও হোটেলে নৈশভোজে continental cuisine এর কথা শুনে বেশ আনন্দেই ছিলাম। আমরা পৌঁছানোর আগেই অন্যান্য সহযাত্রীরা পৌঁছে গেছিলেন।ঢুকে দেখলাম সবার সামনে প্লেটভর্তি লেটুসব্রোকোলি,  বাঁধা কপির পাতা,শশাবীটরুট ইত্যাদি।দেখে তো আমাদের চোখ ছানাবড়া! আমাদের ও serve করা হল একই প্লেট। আমরা তিনজন খুব sad হয়ে একে অন্যের দিকে বিমর্ষমুখে ইশারায় ইঙ্গিত করলাম " বেড়াতে এসে এই সব শাকপাতা দিয়ে dinner করতে হবে?" আমার যুবক ছেলে তো একটু বেশিই দুঃখী হয়ে গেল। ভাবছি কি alternate ব্যবস্থা করা যায় at least ওর জন্যবাইরের departmental storeও বন্ধ হয়ে গেছে!ওকেই পাঠালাম kitchen এর ভেতর staff কে জিজ্ঞাসা করার জন্য alternate কিছু আছে কিনা! কিছুক্ষণ পর ও একগাল হাসি নিয়ে বেরিয়ে এল।বলল ভেতরে ready হচ্ছে roasted chicken. এই starter saladএর পর আসবে main course.  কিছুক্ষণ পর নতুন plate এল বিশাল গরম chicken , bread sandwitch, অন্যান্য item, fruits ও dessert সহকারে main course. মন খুশীতে ভরে গেল আর আমরা বিশাল চাপ থেকে মুক্তি পেলাম। তৃপ্তি ভরে খাবার পর সবাই নিজের নিজের ঘরের দিকে অগ্রসর হল।আমি 1st floor এর dining হলের জানলা দিয়ে দেখলাম গোধূলি বেলায় পাহাড় ও তৃণভূমিতে ঘেরা লেক অতুলনীয়  সুন্দর লাগছে। Dining হলের counter এ সাজানো রয়েছে নানা ধরনের tea bag. Twining এর একটা “Lady grey” tea bag দিয়ে liquor চা বানিয়ে জানলার ধারে বসে  সেবন করতে করতে অন্ধকার না হওয়া পর্যন্ত এই অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে মন ক্যামেরায় বন্দী করে ধীরে ধীরে নিজের ঘরের দিকে এগোলাম।শয্যাশায়ী হয়ে সারাদিনের সব সুন্দর দৃশ্য আর অভিজ্ঞতার ছবি মনের মণিকোঠা থেকে চোখের সামনে ভাসিয়ে দিনের ইতি টানলাম।






মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

Scandinavia-2

কাফেরগাঁও ভ্রমণ